ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

ভুয়া কোটায় হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ

"মুজিবনগর কর্মচারী" কোটায় ভুয়া সনদে ১৯০ জনের নিয়োগের অভিযোগ


  • আপলোড সময় : রবিবার ০৫ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৮:৩৫ পিএম

আব্দুল কাইয়ুম খান, বিশেষ প্রতিনিধি: 

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে "মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী" কোটা ব্যবহার করে এবং ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ দাখিল করে সাব-রেজিস্ট্রারসহ প্রায় ১৯০ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গণঅভিযোগ ও বিভিন্ন মহলে দাখিলকৃত নথির ওপর ভিত্তি করে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের নবম ও দশম গ্রেডের এই বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা সম্পূর্ণ জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বিগত বছরগুলোতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও সাব-রেজিস্ট্রারদের প্রকৃত বয়স ছিল মাত্র ২ থেকে ৭ বছরের মধ্যে। এত কম বয়সে কীভাবে তারা মুজিবনগর সরকারের অফিশিয়াল কর্মচারী হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন, তা নিয়ে এখন আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন উঠেছে। সচেতন মহল ও অভিযোগকারীদের দাবি, এই ভুয়া নিয়োগের কারণে বিগত বছরগুলোতে রাষ্ট্র শত শত কোটি টাকার প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

এই চাঞ্চল্যকর অনিয়মের মূল অভিযুক্ত হিসেবে নাম এসেছে সাব-রেজিস্ট্রার ওসমান গনি মন্ডলের। তিনি বর্তমানে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত আছেন। প্রাপ্ত অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সাব-রেজিস্ট্রার ওসমান গনি মন্ডলের বয়স ছিল মাত্র ৭ বছর। কিন্তু এই অবাস্তব বয়স থাকা সত্ত্বেও তিনি নথিপত্রে নিজেকে "মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী" হিসেবে দাবি করেন এবং সেই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ দাখিল করে অত্যন্ত চতুরতার সাথে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। শুধু তাই নয়, জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার পর ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও জনমহলে তীব্র গুঞ্জন রয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে জোর আলোচনা রয়েছে যে, সাব-রেজিস্ট্রার ওসমান গনি মন্ডলের নামে রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর এবং দেশের অন্যান্য বিভিন্ন জেলা ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় শতকোটি টাকার জমি, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও একাধিক লাভজনক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে রহস্যজনকভাবে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রকাশিত কোনো তালিকায় এখন পর্যন্ত তাঁর নাম না থাকায় জনমনে ক্ষোভ ও বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে।

ওসমান গনি মন্ডল ছাড়াও এই ভুয়া কোটা চক্রের সাথে আরও ১৮৯ জন ব্যক্তি জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগে জানা গেছে। এই ১৯০ জনের পুরো তালিকাটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা প্রত্যেকেই একই কায়দায় "মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী" কোটাটি ব্যবহার করে অবৈধ সুবিধা লুটেছেন। অভিযোগে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, এই কর্মকর্তাদের অনেকেরই ১৯৭১ সালে প্রকৃত বয়স ছিল মাত্র ২ বছর, ৫ বছর কিংবা ৭ বছর। এই শিশু বয়সেই তারা কীভাবে মুজিবনগর সরকারের মতো একটি ঐতিহাসিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে সরাসরি কর্মচারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তা কোনো সাধারণ যৌক্তিকতায় মেলাানো সম্ভব নয়। বর্তমানে তাদের মধ্যে অনেকে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং বাকিরা সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের নবম ও দশম গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে বহাল তবিয়তে আছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এই ভুয়া সনদের ওপর ভর করে চাকরি টিকিয়ে রেখে বিগত বছরগুলোতে তারা প্রত্যেকেই "শত শত কোটি টাকা অবৈধভাবে আয়" করেছেন এবং রাষ্ট্রের পকেট কেটে নিজেদের পকেট ভারী করেছেন।

এই ভয়ংকর জালিয়াতির পেছনে এক ধরনের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা আশকারা ছিল বলেও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযোগকারীগণের স্পষ্ট ভাষ্য, দেশের সংবেদনশীল এই বিষয়টি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় দীর্ঘদিন ধরে এক প্রকার নীরব ভূমিকা পালন করছে এবং কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। দেশের প্রচলিত আদালত প্রসঙ্গে অভিযোগে বলা হয়, সাবেক আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল এবং সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হকের দায়িত্বপালনকালীন সময়ে মহামান্য হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশনের মাধ্যমে এই ১৯০ জন ভুয়া সনদধারীকে সুকৌশলে চাকরিতে বহাল রাখা হয়েছিল। অভিযোগকারীদের দৃঢ় দাবি, মহামান্য হাইকোর্টের কোনো একটি নির্দিষ্ট আদেশ যদি সরকারের পক্ষ থেকে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হতো, তবে অনেক আগেই এই ১৯০ জনের চাকরি চলে যেত। একই সাথে, তাদের বিগত দিনের সমস্ত অবৈধ আয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনা সম্ভব হতো। কিন্তু তৎকালীন প্রভাবশালী মহলের কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি।

দেশের প্রচলিত আইন ও নীতিগত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ১৯০ জনের কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) এবং মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আইন ও জামুকা (JAMUKA) নীতিমালা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বা সরকারি কাজে অংশগ্রহণের জন্য একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম বয়স ও সশস্ত্র বা দাপ্তরিক অংশগ্রহণের অকাট্য প্রমাণের আইনি শর্ত রয়েছে। ২ থেকে ৭ বছরের শিশুদের ক্ষেত্রে এই শর্ত কোনোভাবেই প্রযোজ্য হতে পারে না। ফলে ভুয়া ও জাল সনদ দাখিল করে সরকারি চাকরি গ্রহণ করা বাংলাদেশের প্রচলিত দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারা অনুযায়ী স্পষ্ট জালিয়াতি এবং একটি বড় ফৌজদারি অপরাধ। পাশাপাশি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন ২০০৪ এর ২৭ ধারা অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের শামিল। এই ভুয়া নিয়োগের কারণে বেতন-ভাতা, পেনশন ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বাবদ সরকারের যে হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় হয়েছে, তা সরাসরি জনগণের অর্থের ওপর বড় আঘাত।

এই জাতীয় জালিয়াতি ও দুর্নীতি প্রতিরোধে দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ চারটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ ও করণীয় তুলে ধরেছেন। প্রথমত, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বা জামুকার (JAMUKA) মাধ্যমে এই ১৯০ জন কর্মকর্তার সনদ ও বয়স পুনরায় কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করে একটি স্বচ্ছ প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক (ACC) আইন অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ জারি করতে হবে এবং তাদের অবৈধ আয়ের মূল উৎসের সন্ধানে গভীর তদন্ত শুরু করতে হবে। তৃতীয়ত, মহামান্য হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট কোনো পূর্ববর্তী নির্দেশনা বা আদেশ থাকলে তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে। চতুর্থত, এই কোটার স্বচ্ছতা নিশ্চিতে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে "মুজিবনগর কর্মচারী" কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত দেশের সকল সাব-রেজিস্ট্রারের একটি পূর্ণাঙ্গ ও প্রকাশ্য তালিকা জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত।

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মহোদয়ের বরাবর সাধারণ জনগণের পক্ষে সবিনয় অনুরোধ জানানো হয়েছে যে, এই ১৯০ জন ভুয়া সাব-রেজিস্ট্রার ও কর্মকর্তার সনদ অবিলম্বে বাতিল করা হোক। যারা জালিয়াতি করে বিগত দিনে চাকরি করেছেন এবং যারা বর্তমানেও বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন, তাদের সমস্ত অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করা হোক। পাশাপাশি, পূর্বের কর্মকর্তাদের ঘুষ বাণিজ্যের কারণে মহামান্য আদালতে যে 'স্টে অর্ডার' (STAY Order) বহাল রয়েছে, তা প্রত্যাহারের (Vacant করার) কোনো কার্যকর উদ্যোগ বিগত দিনে নেওয়া হয়নি। বর্তমান আইনমন্ত্রী মহোদয় এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মহোদয় যদি এই বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মহামান্য হাইকোর্টে শক্তিশালী আইনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলেন, তবে অতি দ্রুত ওই 'স্টে অর্ডার ভ্যাকেন্ট' (Stay order vacant) করা সম্ভব হবে। এর ফলে ১৯০ জন সাব-রেজিস্ট্রার যারা বিগত দিনে অবৈধভাবে চাকরি করেছেন এবং এখনো করছেন, তাদের সকলের চাকরি তাৎক্ষণিকভাবে চলে যাবে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র এই ১৯০ জন সাব-রেজিস্ট্রারের হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করতে পারবে এবং দেশের প্রচলিত আদালতের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর